চাকুরি অথবা ব্যবসা, না কি চলবে দুটোই?

0
941
Designed by luis_molinero

লিখেছেন ইনামুল হাফিজ লতিফী,

 

করোনাভাইরাসের কারণে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বেসরকারি চাকুরিজীবিদের একটা বড় অংশেরই আয়ের পরিমান কমে এসেছে। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আবার ঝুঁকেছে কর্মী ছাটাই এর দিকে, যার ফলে অনেকেই ভাল আয়ের চাকুরি হারিয়েছেন এবং নতুন করে যোগ দিয়েছেন তুলনামূলক কম বেতনের চাকুরিতে।

 

এই অবস্থায় দেশের বেসরকারি চাকুরিজীবিদের অনেকেই চাচ্ছেন নতুন করে কিছু করতে, যাতে করে আয়ের পরিমান আগের পর্যায়ে নিয়ে আসা যায়।

 

এ চিন্তা করতে গিয়ে আবার অনেকে দ্বিধায় পড়ছেন, যে চাকুরি ছেড়ে দিয়েই কি তিনি কোন ব্যবসায় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন না কি চাকুরির পাশাপাশি কোন ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। যারা এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধায় আছেন, তাদের জন্য নীচে উল্লেখিত কিছু বিষয় পড়ে নিয়ে এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন।

 

প্রাথমিকভাবে যেকোন বাণিজ্যিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে গেলেই দুটো জিনিস একনজর দেখে নিতে হয়- ১) দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে এখন কি পর্যায়ে আছে, ২) যে খাত-উপখাতে বাণিজ্যিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে চাচ্ছেন সেই খাত-উপখাতের বর্তমান উদ্যোক্তারা কি কি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন এবং তা থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসছেন

 

স্বাভাবিকভাবেই যারা দীর্ঘ সময় ধরে চাকুরি করে যাচ্ছেন তারা তাদের কমফোর্ট জোন্‌ থেকে বেরিয়ে আসতে চাওয়ার সময় একধরণের দ্বিধায় থাকেন, যে চাকুরি ছেড়ে পুরোপুরিভাবে ব্যবসায় মনোযোগ দিবেন কি না, না কি চাকুরির পাশাপাশি ব্যবসা করে যাবেন। আবার সংকটময় এই সময়ে কর্মস্থলের তিক্ততার কারণে, পারলে অনেকে এখনই চাকুরি ছেড়ে দিয়ে ব্যাবসায় নেমে পড়েন, কিন্তু প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়– পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রাপ্তি

 

তবে এধরণের কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় নীচে উল্লেখিত কিছু বিষয় অবশ্যই ভেবে দেখা উচিত-

 

১। এক্টিভ ইনকাম এবং প্যাসিভ ইনকামঃ এখনকার সময়টা হচ্ছে আয়ের পোর্টফোলিও যতোভাবে বাড়ানো যায় সেই সময়, চাকরি করা মানে হচ্ছে সময়-মেধা দেয়া, এবং সময়-মেধা দেয়াও একধরণের বিনিয়োগ, আর এর রিটার্ন হচ্ছে প্রতি মাসের স্যালারি। আয়ের পোর্টফোলিও দুইভাবে সাজানো যেতে পারে- ১) এক্টিভ ইনকাম চ্যানেল, ২) প্যাসিভ ইনকাম চ্যানেল।

 

প্রসঙ্গত, এক্টিভ ইনকাম বলতে বোঝায়, যখন আপনি সরাসরি কোন কাজ করছেন এবং সেখান থেকে প্রত্যক্ষভাবে আয় করছেন, উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, আপনার চাকুরি করা অথবা সরাসরি কোন ব্যবসা নিজে প্রতিদিন পরিচালনা করা। অন্যদিকে, প্যাসিভ ইনকাম বলতে বোঝায়, আপনি কোনকিছুতে অর্থ বিনিয়োগ করলেন এবং সেখান থেকে আপনার প্রতিদিন অংশগ্রহণ ছাড়াই প্রতিনিয়ত একটা রিটার্ন আসছে, যেমনঃ আপনি কোন ফ্ল্যাট কিনলেন এবং সেটা ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে আপনার যে আয় হয় সেটা প্যাসিভ ইনকাম। প্যাসিভ ইনকামের আরও উৎস হতে পারে, ব্যাংকের মাসিক ইনকাম স্কিম, শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ (যদিও দেশের শেয়ার বাজার এখন প্রচন্ড ঝুঁকির মাঝে আছে), অথবা বাংলাদেশের জাতীয় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ থেকে আয়।

 

যাই হোক, এক্টিভ ইনকাম চ্যানেল হিসেবে দেখা যেতে পারে বর্তমান চাকুরিকে, সাথে সাথে ব্যবসায় নিজের অংশগ্রহণ প্যাসিভ করে নেয়া যেতে পারে যদি আরও কয়েকজন ব্যবসায়ি অংশীদার থাকে এবং তাদের এক্টিভ অংশগ্রহণ যদি সেখানে থাকে। ভেবে দেখতে পারেন, এই সুযোগ আপনার পরিকল্পনা করা ব্যবসায়িক উদ্যোগে আছে কি না।

 

এক্টিভ ইনকামের মাঝেও বৈচিত্র্য আনা যায়, যেমন, এখন অনেকেই ঘরেই রেস্তোরার মতো রান্না করে এবং সামাজিক যোগোযোগ মাধ্যম অর্থ্যাৎ ফেইসবুক অথবা ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে বিভিন্ন রান্না করা ডিশের ফটো শেয়ার করে খাবারের অর্ডার নিচ্ছেন এবং সেগুলো বিক্রয় করে ভাল মুনাফা অর্জন করছেন। এক্ষেত্রে রেস্তোরার মতো বড় বিনিয়োগে যেতে হচ্ছে না, তাই ব্যবসায়িক ঝুঁকি কম, আবার চাকুরির পাশাপাশি অনেকেই তাদের রান্নার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ভাল আয় করে নিচ্ছেন। এভাবেই, অনেকে ম্যাগাজিনের জন্য লেখালেখি করেও আয় করে নিচ্ছেন।

 

২। প্রতিযোগিতামূলক বাজার বনাম ব্র্যান্ড ভ্যালুঃ এমনিতেই বর্তমানের বাজার খুবই প্রতিযোগিতামূলক, পণ্যের বা সেবার মূল্য যদি একটু হেরফের হয় তবেই ক্রেতা সরে যায়, আবার ব্র্যান্ড ভ্যালু শক্তিশালী হলে মানুষ সেখানে খরচ করতে দ্বিধা করেন না, এই দুই বিপরীত অবস্থার মাঝে বাজারে নিজের অবস্থান শক্ত করতে এখন পুরো ভ্যালুচেইনে ইনোভেশনের দরকার হয়। সাথেসাথে মার্কেটিং ও ডিস্ট্রিবিউশনের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই।

 

বাংলাদেশে ঈদ-উল-আজ্‌হা এর ঠিক ৬-৭ মাস আগে থেকে একটা ট্রেন্ড দেখা যায় যে অনেকে গরু-মহিষ মোটাতাজাকরণ প্রকল্প হাতে নেন, আবার ইদানীং অনেকেই বায়োফ্লকের মাধ্যমে মাছ চাষে মনোনিবেশ করছেন। এধরণের যেকোন উদ্যোগই প্রশংসনীয়, তবে গবাদিপশু পালন, মাছ চাষ অথবা কৃষিক্ষেত্রের কোন প্রকল্প গ্রহণের সময় জায়গা নির্বাচন, সেখান থেকে প্রতিষ্ঠিত নিকটবর্তী বাজারের দূরত্ব, সেখানে নিজের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা ও মূল্য কেমন, গ্রহণ করা প্রকল্পের প্রয়োজনীয় মালামাল, সার, পশুর-মাছের খাবার, ইত্যাদি কতো কম মূল্যে তবে ভাল মানেরটা সহজলভ্য‌ কিনা, দূরের কেন্দ্রীয় বাজারে নিতে হলে পরিবহন খরচ কত আসে, ইত্যাদি অনেকগুলো বিষয় খুব ভালভাবে হিসেব করতে হয়।

 

যেমনঃ এক্যুয়াকালচার অর্থ্যাৎ মৎস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে এখন অনেকেই বায়োফ্লক পদ্ধতি ব্যবহার করে কম জায়গায় প্রচুর মাছ উৎপাদন করার প্রকল্প নিয়েছেন, এক্ষেত্রে বেশিরভাগই তাদের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা বা চাকুরির পাশাপাশি প্রথমে টেস্ট কেইস্‌ বেসিসে শুরু করছেন, তারপর যখন দেখছেন ভাল হচ্ছে, তখন এর আওতা বাড়াচ্ছেন এবং সেটি ঐ আরেকটা পেশার সাথে তাল মিলিয়েই করে যাচ্ছেন। বায়োফ্লকের ক্ষেত্রে একটি প্রধান সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাণিজ্যিকভাবে যেতে চাইলে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহযোগিতা এখনো সেভাবে আসেনি এবং এই সম্পর্কিত সরকারের তরফ থেকে দেয়া ট্রেনিং ও দেশব্যাপী বিস্তৃত নয়। আশার বিষয় হচ্ছে, বায়োফ্লকের উদ্যোক্তারা নিজেরা কমিউনিটি গঠন করে নিয়েছেন এবং নিজেদের মাঝে আলোচনা করেই তারা সমস্যাগুলোর সমাধান সুন্দরভাবে করে নিচ্ছেন।

 

৩। ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং ব্যবসায়ের অংশীদারঃ এই দুটি জিনিষের উপর ব্যবসায়িক বা যে কোন উদ্যোগের সাফল্য প্রায় পুরোটাই নির্ভরশীল। নিজের মনের মতো এই দুটি মিলাতে গিয়ে ৯-১০ বছরও অপেক্ষা করেন কেউ কেউ এবং এদের মাঝে অনেকেই সফল। ব্যবসায়িক পরিকল্পনার সাথে ব্যবসায়িক দূরদৃষ্টিতা পুরোপুরিভাবে জড়িত, এবং ব্যবসায়িক সফলতার সাথে খুব বয়সেই ব্যবসা শুরু করার যে মিথ আছে তার আসলে কোন সম্পর্ক নেই। এক্ষেত্রে খুব ভাল উদাহরণ হতে পারেন অন্যতম সফল সামাজিক মাধ্যম লিঙ্কড্‌ইনের কোফাউন্ডার ও বর্তমান প্রশাসনিক চেয়ারপার্সন– রিড্‌ হফ্‌ম্যান, যিনি লিঙ্কড্‌ইন শুরু করেছিলেন তার ৩৫ বছর বয়সে, এর পূর্বে অনেকগুলো প্রকল্প নিয়ে ছোটখাটোভাবে পরীক্ষা চালিয়ে গিয়ছিলেন সলিড্‌ কোন আইডিয়া এবং যুৎসই পরিকল্পনার খোঁজে।

 

আপনি ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছেন শুনলে আশেপাশের মানুষদের থেকে মূলত দুই ধরণের উপদেশ পাবেন– ১) ব্যবসা-বাণিজ্য আপনার জন্য না, আপনি সফল হবে না; ২)  এতো চিন্তা-পরিকল্পনা করার কিছু নেই, ব্যবসা করতে আজই নেমে যান, নামলেই শিখতে পারবেন। এই দুই ধরণের কথাই আসলে বিপদজনক। প্রথম কথাটি হচ্ছে খুব পেসিমিস্ট, আবার দ্বিতীয় উপদেশটি হচ্ছে খুব বেশি অপ্টিমিস্টিক।

 

প্রথমত, ব্যবসা-বাণিজ্য সফল হবেন কি হবেন না, তা সবচাইতে ভাল আপনিই জানবেন কারণ পরিকল্পনাটা আপনার এবং ঐ পরিকল্পনা তৈরি করতে আপনি যে সময় ব্যয় করেছেন তা অন্য কেউ করেননি। দ্বিতীয়ত, আপনি ব্যবসা-বাণিজ্য কি শেখার জন্য নামছেন না কি লাভ করার উদ্দেশ্য নিয়ে নামছেন, সেটাও আপনিই ঠিক করবেন।

 

শেখার জন্য জন্য নিজেই সেই ব্যবসা শুরু করতে হবে তা নয়, অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা যায়, অথবা অন্য কারও একই ধরণের ব্যবসায় কয়েক মাস থেকেও শিখে নেয়া যায়। আর যদি লাভের উদ্দেশ্য নিয়ে নামতে হয়, সেক্ষেত্রেও আপনার চিন্তা করা ব্যবসায়িক প্রকল্পের সব বিষয় ভালভাবে জেনে তবেই নামা উচিত, হুট্‌ করে নেমে অনেকে মৌসুমি ব্যবসায়ির মতো একটা ক্ষেত্রে এসে সম্পূর্ণ পুঁজি হারিয়ে একেবারে গঁটিয়ে যান, এটা হতে দেয়া যাবেনা। আর জানার জন্য নিজে কোন ধাক্কা খেতে হবে ব্যাপারটা আসলে তা না, অনেকের সাথে দিনের পর দিন কথা বলে, তাদের উদ্যোগ পরিদর্শন‌ করেও জিনিসগুলো বুঝে নেয়া যায়।

 

উপরের এই বিষয়গুলো পড়ার পরে আপনিই সবচাইতে ভাল সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন যে করোনাভাইরাসের এই সময়ে ব্যবসায় কি আপনি পুরোপুরি মনোনিবেশ করবেন না কি চাকুরির পাশাপাশি আগামী কয়েক মাস পরিচালনা করে এরপর সেদিকে পুরোপুরি যাবেন।

 

মনে রাখতে হবে, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং সে অনুযায়ী লক্ষ্য ঠিক রেখে পরিকল্পনামাফিক ব্যবসায়ের প্রতিদিনকার কাজগুলো করে যাওয়াই আপনাকে সাফল্য এনে দিতে পারে, সেটা যে পদ্ধতিতেই হোক না কেনো।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here