করোনাভাইরাসের সাথে যুদ্ধে কি আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি?

0
2631
খোলা-বন্ধের ‘খেলায়’ প্রাণবাজি রেখে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে শ্রমিকদের ঢাকায় আসা এবং আবার নিজেদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার এক পর্যায়। ছবিঃ কালের কন্ঠ

লিখেছেন ইনামুল হাফিজ লতিফী,

 

এই বছরের জানুয়ারির দিকের ঘটনা, চীন থেকে একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কল্‌‌ দিলেন। তিনি উহান ইউনিভার্সিটি অব্‌ সাইন্স এন্ড টেকনোলজি-তে মাস্টার্স করছেন থিসিস-সহ। কল্‌ দিয়েছেন মূলত থিসিসের টপিক নিয়ে আলোচনা করার জন্য। জিজ্ঞেস করলেন আমি ঊনার বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুক প্রফেসরের সাথে আগে কোন কাজ করেছি কি না, কারণ ঊনার সেই প্রফেসর আমার নাম রেফার করেছেন বিশেষ করে বাংলাদেশের খাত ও শিল্পভিত্তিক অগ্রগতি নিয়ে কথা বলার জন্য। আমি জানালাম, আমি টুকটাক লেখালেখি করেছি, তবে চীনের কারও সাথে কাজ করা হয়নি এখনো।

 

যেহেতু, সময়টা ছিল জানুয়ারি- করোনাভাইরাসের সময়, আর ঊনি একেবারে উৎপত্তিস্থলে ছিলেন, আমি ঘুরেফিরে বারবার তখন করোনাভাইরাস বিষয়ে জানতে চাচ্ছিলাম। বিশ্বমিডিয়া তখন চীনের বিভিন্ন আইসোলেশন-লক্‌ডাউনের পদক্ষেপগুলোকে আলগা রঙ লাগিয়ে প্রচার করছিল, বিশ্বকে বিশ্বাস করাতে চাইছিল যে চীন সেখানে প্রায় ১ কোটি মানুষকে জেলখানার মতো অবস্থায় রেখেছে, তারা তাদের দেশেই অপ্রত্যাশিত এবং নিগৃহীত (১)। ব্যাপারটা আসলে মোটেও তা ছিল না, বরং পরিকল্পিত এবং কঠিন লক্‌ডাউন আর আইসোলেশনের মাধ্যমে কোভিড-১৯ কে কাবু করাই ছিল তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। চীন তাই এসব ফালতু আলোচনা-সমালোচনা নিয়ে মোটেও সময় নষ্ট করেনি।

 

সেই শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তারা সেখানে ‘বিদেশি’ হওয়ার কারণে এই দুরাবস্থায় কোন বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন কি না। ঊনি প্রত্যুত্তরে বলছেলিন, না সেরকম কিছু হচ্ছে না, তবে বাইরে একেবারেই হতে দেয়া হচ্ছে না, খাবার-বাজার কোনকিছুর জন্যেই না। সাথে ঊনি যোগ করেছিলেন, এই দুরাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ, ফ্যাকাল্টি আর তাদের পরিবারবর্গ তাদের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন, তাদেরকে প্রায় প্রতিদিন খাবার রান্না করে খাবার সরবরাহ করতেন।

 

চীনের এই কৌশল থেকে অনেক কিছুই শেখার ছিল আমাদের। চীন যদিও এখন সেকেন্ড করোনাভাইরাস ওয়েভে আক্রান্ত হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে তারা প্রথমবার যেভাবে সামলে নিয়েছে, শতবার আক্রান্ত হলেও এভাবেই খুব পরিকল্পিত আর কঠোরভাবেই সব ব্যবস্থাপনা করে কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ করবেই- এবং এই নিয়ন্ত্রিণ ব্যবস্থাই তাদের জাতিগত সামষ্টিক উন্নতির অন্যতম কারণও বটে।

 

যাই হোক, কথা হলো- বাংলাদেশ এই পুরোটা সময় একধরণের দ্বিধার মাঝে ছিল, পাব্লিক হলিডে, পার্শিয়াল লক্‌ডাউন, রেড-ইয়েলো-গ্রিন জোনিং, কোনটাই নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত আইডিয়া নয়, বরং ভারত যে যে দিন ঘোষণা করেছে, ঠিক তার কিছু আগে-পরে একধরণের অনুসরণমূলক নীতি গ্রহণ করেছে। এতে করে কোনকিছুর ব্যবস্থাপনাই ঠিকমতো গুছিয়ে উঠতে পারেনি।

 

ভিয়েতনাম আরেক সফল দেশ, যে দেশ প্রায় চীনের প্রায় কাছাকাছি সময়ে আক্রান্ত হলেও এখনো পর্যন্ত সেদেশে করোনাভাইরাসের কারণে একজনও মৃত্যুবরণ করেনি, এক্টিভ্‌ কেইস এখন মাত্র ২২টি। আন্তর্জাতিক মিডিয়া সেটাকে দরকারের চেয়ে বেশি জোরালো প্রতিক্রিয়া হিসাবে বিভিন্ন সময়ে প্রচার করলেও ভিয়েতনামও সেদিকে কান দেয়নি, পড়ে মিডিয়াই স্বীকার করে নিয়েছে একারণেই ভিয়েতনাম সফল (২), (৩)।

 

চীন এবং ভিয়েতনামের মানুষ স্বভাবগতভাবে বাংলাদেশের মানুষের চেয়ে শতগুণে বেশি বৈষয়িক, অর্থের চেয়ে বেশি ভালোবাসাময় তাদের কাছে হয়তো কম অনুভূতিই আছে, অথচ তারা একবারও ‘জীবন আর জীবিকা” এর ব্যাখ্যা দিয়ে এবং সেই অনুযায়ী পলিসি নিয়ে মানুষকে কনফিউজড্‌ করেনি। ভিয়েতনামের কোভিড-১৯ এর সাথে এই রাউন্ডের যুদ্ধে জয়ের কারণ হিসেবে দেখা হয় ভয়াবহ এই অবস্থার মাঝে সে দেশের সরকারের দৃঢ় নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতাকে যার কারণে মানুষ এই ব্যাপারে একসুরে একভাবে কাজ করে গেছে (৪)।

 

আমাদের অসাড়তা আসলে সেখানেই।

 

১) https://edition.cnn.com/2020/02/01/asia/coronavirus-wuhan-discrimination-intl-hnk/index.html
২) https://www.bbc.com/news/world-asia-52628283
৩) https://www.weforum.org/agenda/2020/03/vietnam-contain-covid-19-limited-resources/
৪) https://www.reuters.com/article/us-health-coronavirus-who-asiapac-vietna/vietnams-leadership-public-showing-strong-response-to-contain-coronavirus-who-idUSKBN2230EQ

~ #ইহাল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here